ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৭, ৬ মাঘ ১৪২৩

আলোচিত ভিডিও

শান্তিনিকেতনের স্পর্শ..

শান্তিনিকেতনের স্পর্শ..

জহির চৌধুরী
ভালবেসে সখি নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে। আমারও পরাণে যে গান বাজিছে তাহার তালটি শিখো তোমার চরণ মঞ্জিরে। যথার্থই লিখেছিলেন কবি গুরু। ইতিহাস, বই-পুস্তুকে কবি গুরুর নাম পড়ার পরেও জানার পরেও কবির প্রতি ভালোবাসা যেন মনের মন্দিরে জায়গা করে নিতে পারে সহজেই।

অনেক আগ থেকেই শান্তির কবির শান্তিনিকেতনে ঘুরে আসার ইচ্ছা থাকলেও ভাগ্য বিধাতা সহায় না হওয়ার কারনে পারিনি ঘুরে আসতে।যদিও টাকা পয়সার অনেকটা ঝামেলা ভারতবর্ষে বিরাজ করছে। কিন্তু কিছু করার নেই, এবার যেতেই হবে। না হলে ভিসার মেয়াদ শেষের পথে প্রায়। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।

অল্প টাকায় কিভাবে মনের শান্তির জন্য শান্তিনিকেতন পৌঁছানো যায় সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাত্রা শুরু, আমার সাথে ছিল বন্ধুবর মনোজ মল্লিক। ঢাকা থেকে বেনাপল বর্ডারে খুব সকালে পৌঁছাতে না পারলেও সকাল ৯.১০ এ পা ফেলতে পেরেছিলাম ভারতের মাটি থেকে একটু দূরে বাংলাদেশের সীমানার প্রান্তে। অনেকেই ভাবতে পারেন বর্ডার এলাকাটা দালালে ভরা। ভেবে থাকলেও ভূল ভাবা হয়নি আপনার। কিন্তু আরেকটু খুশি (!) হবেন যখন জানবেন দুই বাংলার এপার ওপাড়ের বর্ডারে “সুসজ্জিত ড্রেস পরিহীত” দালালচক্র গঠনে চুক্তি হয়েছে দুই বাংলার।

হ্যাঁ তারা পুলিশ বাহিনী। তাদের সরকারী দায়ীত্বের সহায়তা যখনি আপনি চাইতে যাবেন তখনি আপনাকে অফার করা হবে, ২০০ টাকা দিন সব কাজ করে দিচ্ছি। আপনি নতুন হলে বিষয়টা আপনার খুশিও লাগতে পারে আবার খারাপও লাগতে পারে। আমি ঐ রোডে পুরাতন বিধায় ঘৃনাই লেগেছে বটে। তবে উপরে উল্লেখিত তাদের চুক্তিটা “অলিখিত” ই বটে। এ রকম অসহায় চিটিচিটে গল্পে আমার কোলকাতা ভ্রমণের গল্প শুরু হয় । তবে এই অসহায় চেহারা বদলে যায় বেহালার সরশুনায় মনোজের দিদি বাড়িতে শান্তির প্রতিক এক দল ছোট ভাগিনা-ভাগিনীদের অভ্যর্থনায় এবং ভালোবাসায়।

বোলপুরের ভালোবাসা...... শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে শান্তিনিকেতন এর দূরত্ব বেশি নয়। তিন ঘন্টায় বোলপুর স্টেশনে চলে আসে কাঞ্চনজংলা এক্সপ্রেস। বর্ধমান অতিক্রম করতেই আমার জাতীয় কবি নজরুলের চুরুলিয়ার কথা মনে পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ আর বিদ্রোহী কবি দুজনেই খুব কাছাকাছি থাকতেন। অথচ দুজনের লেখায় কি বৈপরিত্য, কি অসাধারণ সৌন্দর্য্য সে বিপরীতে। বোলপুর থেকে টোটোতে করে গ্রীন চিলি হোটেলে গিয়ে চেঞ্জ করে বেরিয়ে পড়ি শান্তিনিকেতন এর শান্তি অন্বেষণে।

শান্তিনিকেতনে টোটো ভাড়া একটু বেশি। দরদাম করে ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে শান্তিনিকেতন এর মূল ক্যাম্পাসের ১ নং গেটে চলে আসি। শুরুতে ভালো না লাগলেও যত ভিতরে যাই ততই মন প্রাণ ভরে ওঠে শান্তিনিকেতনের শান্ত পরশে। হেমন্তের নিয়ম মেনে কোকিল ডেকে চলেছে উঁচু স্কেলে। গাছ-গাছালি, লাল সুরকি পথ আর পাখির ডাক মিলেমিশে সুররিয়েল ভালো লাগা তৈরি হয়। মনোজ ছবি তোলায় ব্যস্ত হতেই আমি কয়েকটা পোজে বসে যাই। শান্তিনিকেতনের পড়াশোনার মূল জায়গাটাই হলো আউটডোর ক্লাস। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর ক্লাস হচ্ছে খোলা জায়গায়।

হলুদ পাঞ্জাবী সাদা পাজামা ছেলেদের আর মেয়েদের হলুদ শাড়ি-এই হলো স্কুলের ইউনিফর্ম। শান্তিনিকেতনে মেয়েদের অহরহ সাইকেল আর বাইকের চালকের আসনে দেখা যায়। শান্ত মুখে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে শান্ত অথচ দৃপ্ত চেহারার মেয়েগুলো। আমাদের সাথে কলকাতার অঞ্জনের দেখা হয়ে যায়। অনার্স করছে কেমেষ্ট্রীর এর উপরে। ওর কাছেই জানতে পারি বেশ ভালো সংখ্যক বাংলাদেশি পড়ে শান্তিনিকেতনে। শুনে ভালো লাগে। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ুক বাংলাদেশিরা, লাল সবুজ অন্তরে।

অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা বিদ্যা ভবন, পাঠভবন ঘুরে ঘুরে দেখি। ক্যাম্পাসের এর ক্যান্টিনে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। বিভিন্ন ভবন গুলো দেখতে একদম বিটিভির অনেক আগের নাটকের সেট। খড়ের ছাউনি উপরে, এক চিলতে ঘর, পর্দা ফেলে দেয়া ভিতর থেকে বের হয়ে আসছে ছাত্র ছাত্রীরা। তারপর ও প্রান্ত থেকে গরুর দুধে চা গরম আর ব্রেড এন্ড বাটার। বিকেলের দিকে টোটোতে চেপে চলে যাই খোয়াই নদীর পারে আমার কুঠীরে, সেখানে কুঠীর শিল্পের নানান কাজের সমাহারে চোখ জুড়িয়ে যায়। ভালোলাগা বাড়তে থাকে শান্তিনিকেতনের প্রতি। নদী শুকিয়ে কাঠ।

কিন্তু খোয়াই এর নাম ডাক শান্তিনিকেতনের সর্বত্র। প্রথমত রাঙামাটির পথের জন্য। টোটোওয়ালার কাছ থেকে জানতে পাই রবীন্দ্রনাথ এ পথে নিয়েই গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ লিখেছিলেন। আমি তো এতদিন জানতাম সে আমাদের রাঙামাটির গান।

খোয়াই নদীর তীরে সোনাঝুরি মেলা হয়। রাঙা মাটির পথে যেতে যেতে দু'ধারে অজস্র সোনাঝুরি গাছ চোখে পড়ে। আমরা যেদিন গিয়েছি সেদিন মেলা ছিলো না, ফিরে আসার আগে এক বাউলের গান শুনতে পাই, মিলন হবে কত দিনে......লালন সাঁই এর গান। গান শুনে মনটা ভরে গেলো, কথা হলো বাউল এর সাথে, গান দরদ গিয়ে গায় সে, কিন্তু বাংলাদেশে এসে লালন সাঁই এর আখরাইয় আসার সৌভাগ্য এখনো তাঁর হয় নি। বাংলাদেশি শুনে তার চেহারাতেও একটা সুখের ছাপ দেখতে পেলাম।

সেই গানের কয়েকটা লাইন আমি ক্যামেরায় রেকোর্ড করে এনেছি। খুব সুন্দর সুরটা। সন্ধ্যাঁর সূর্য যখন তার মুখখানা আড়াল করতে যাচ্ছে ঠিক তখনি আমরা আমাদের ছোট নদীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, সত্যি হাঁটু জলে এখনো মাখামাখি বিদ্যমান রয়েছে নদীতে।

ডুবতে যাওয়া সূর্য কে তালুর মাঝে রেখে ছবি তুলতে কেউ ভূল করলো না, রাস্তার দুই পাশে বিশাল সব কড়ুই গাছ শান্তিনিকেতনকে একদম সবুজ করে দিয়েছে। 'সবুজ যখন বাঁধে বাসা, গাছের পাতায়, বনে/মনে তখন দুঃখ লুকায় অন্তগহীন কোনে'... শান্তিনিকেতনের অপূর্ব শান্ত বাতাবরণে আমার দুঃখ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। খুব হালকা লাগে নিজেকে। খোয়াইর এই মেলা দেখতে কোলকাতা থেকে অনেক মানুষ আসে ।

কান পাতলে ঢাকার ভাষাও শোনা যায়। চামড়াজাত ব্যাগ, মেয়েদের বাটিক এর নানা সামগ্রী, চাবির রিং, ওয়ালেট, পাঞ্জাবী, হাতে তৈরি তৈজসপত্র সহ নানা রকম রঙ বেরঙের জিনিষপত্র পাওয়া যায় এই মেলায়। সোনাঝুরি মেলার আকর্ষণ হলো বাউলরা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সদলবলে বসে সুর তোলে শব্দের মিঠাই পালে। মেলা থেকে শান্তিনিকেতনে ফেরার পথে তিন পার বটগাছ চোখে পড়ে। পরিমিত লাইটিং আরো আকর্ষণীয় করে তোলে শতবর্ষী বটগাছকে। পাশেই আশ্রম আর উপাসনালয়। এটাও দেখার মত।

আর আছে রবীন্দ্রনাথের মিউজিয়াম, রবীন্দ্র সদন। এটা মাস্ট সি। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত নানা জিনিষপত্র আছে এই রবীন্দ্র সদনে। আছে রবীন্দ্রনাথের ঘর, গাড়ি। ছোট ছোট জিনিষপত্র আর বিশ্বের নানা দেশ থেকে পাওয়া উপহার সামগ্রী তো আছেই। বাংলাদেশ থেকে পাওয়া চপলা বোট-ও চোখে পড়লো। আর চোখ আটকে গেলো আলফ্রেড নোবেল খচিত নোবেল এর রেপ্লিকা দেখে। সত্যি বলি, আমার রবীন্দ্রনাথ প্রীতি ছিলো অনেক আগে থেকে। কিন্তু এবার শান্তিনিকেতন এসে রবীন্দ্রনাথ এর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো জেগে উঠলো।

একটা মানুষ দু হাতে এত এত চমৎকার লিখে গেছেন সেই বিস্ময় তো আছেই, এই যে তার এত কর্মজজ্ঞ পুরো বোলপুর আর শান্তিনিকেতন জুড়ে-এই বিশালতাকে অগ্রাহ্য করে কার সাধ্য! সাধে কি শান্তিনিকেতনের সবার কাছে রবীন্দ্রনাথ হলেন গুরুদেব। পাঠক, মনে আছে কোপাই এর কথা? ''আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকেপার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়িচিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।''

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সেই কবিতার নদী কোপাই এ এই হেমন্ত কালে সত্যি সত্যি হাঁটুজল। চিক চিক বালুও খুঁজে পেলাম। মনটা উদাস হলো আমার। রাস্তা থেকে নেমে নদীর কাছে দুদণ্ড বসে রইলাম কিচ্ছু না ভেবে। এই ধরে রাখা কি জীবনকে? জীবনকে ধরে রাখার এই আকুলতা স্পর্শ করে আমাকেও। আমার শান্তিনিকেতন ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। পরদিন ঘুম থেকে উঠি খুব ভোরে।

মনে পড়ছে শান্তিনিকেতনের কথা, কিন্তু আজই তো চলে যেতে হবে, শান্তিনিকেতন থেকে যাবে, সমবেত রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে একটা দিন শুরু হবে শান্তিনিকেতনের সবার। একটু বেদনা বিধুর টুইংটাং শুনি আমার চারপাশে। সেই টুংটাং নিয়েই চলে যাই ষ্টেশনে। এবার ফেরার পালা। আমাদের ট্রেন প্ল্যাটফর্মে চলে এসেছে। আমরাও স্টেশনে চলেএসেছি। বোলপুর থেকে মালদা হাওরা এক্সপ্রেসে চেপে বসে বিদায় জানাই শান্তিনিকেতন-কে। গন্তব্য কোলকাতা। শান্তিনিকেতন, তোমায় ভালবাসি, ভালবাসবো।ভালো থেকো টুকরো স্মৃতির এ্যালবাম হয়ে।

Posted by Newsi24

লেখকের কলাম এর সর্বশেষ খবর



রে